Header Ads

Header ADS

আমার দাদা

সময়টা ২০১৩ সালের।  বার্ষিক পরীক্ষার ছুটি হয়েছে দুদিন আগে। বিশেষ প্রয়োজনে আব্বুর দাদাবাড়িতে যেতে হবে। বায়না ধরায় আমাকেও সাথে নিলেন। দাদাবাড়িতে গিয়ে আমার অবস্থা বেগতিক। কাউকে চিনিনা। আবার সবাই আমাকে চেনে। কেউ চাচা, কেউ বাবা,আর কেউ ভাইয়া বলে ডাক দেয়। আমি তো ভেবে পাইনা কাকে কী বলে ডাকবো! কারণ, আমার দাদার সাত ছেলে। সবাই বাইরে থাকে। এই ছুটিতে প্রায় সবাই বেড়াতে এসেছে। আমি ছোট থাকতে গেলেও বুঝ হওয়ার পর আর যাইনি।  তাই সবাইকে দেখে এমন হাঁফিয়ে উঠছি।

দাদাবাড়ি অবস্থানের দ্বিতীয় দিন।  বুঝতে পারছি আমার দাদার রেখে যাওয়া স্মৃতি আমি এই দুদিনে আত্মস্থ করতে পারবো না। তবুও সবাইকে মোটামুটি চিনে ফেলেছি। বিকালের দিকে এক  চাচাতো ভাই বললো- চল না,  দাদাকে দেখে আসি! দাদাকে দেখতে যাবার কথা শুনে এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। রওয়ানা হলাম সবাই মিলে। গ্রামের  মেঠো পথে প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর কবরস্থানে গিয়ে দাঁড়ালাম। অনেকগুলো কবরের মাঝে দাদার কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। অন্যরকম এক কষ্টকর অনুভূতি! সবার মনটা ভরাক্রান্ত। উপস্থিত আমরা সবাই দাদার সাক্ষাত থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এমনকি চাচারাও দাদার স্নেহ পান নি অনেকেই। দাদার ব্যাপারে আমার আব্বু খুব অল্পই বলতেন। কখনো বেশী জোর করলে একটু-আধটু বলতেন। তবে দাদাকে নিয়ে তাঁর ছিলো বুক ভরা গর্ব। তাঁর জীবনে সফলতার পথনির্দেশক নাকি দাদাই ছিলেন। আমাদের এভাবে ইলমী ও আমলী পরিবেশে গড়ে ওঠার পেছনে নাকি দাদার উপদেশমূলক কথাগুলোই নাকি বেশী কাজ করতো আব্বুর মাঝে। দোয়া শুরু হলো। বুঝতাম না খুব একটা। তবে অনেক কান্না আসছিলো। তাই এই দোয়ার মুহূর্তে খুব করে দোয়া করলাম। আর মনে মনে দাদাকে জানার, দাদার স্মৃতিকে আরো প্রাণবন্ত করার তওফিক চাইলাম আল্লাহর কাছে। 

সেদিন সেখান থেকে ফেরার পর অনেক খারাপ লাগছিলো। আব্বুকে জোর করে বাসায় নিয়ে এলাম। দাদার বিষয়ে জানতে চাইলে আমাকে তাঁর অনেক স্মৃতি শোনালেন। আমি  অবাক,নিস্তব্ধ হয়ে শুনে গেলাম। দাদা ছিলেন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তিনি ছিলেন এলাকার মসজিদের খতিব। ছিলেন স্পষ্টভাষী। এলাকার সবাই একবাক্যে তাঁকে চিনতো। এমনকি আশপাশের দশগ্রামেও তাঁর সচ্চরিত্রতার কথা সর্বজনবিদিত ছিলো। তিনি আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় পেতেন না। একাত্তরের গোলাগুলিতে তিনি ছিলেন সাহসীবীর। সদর্পে সবকিছু করছিলেন। নাজুক অবস্থার মাঝে একদিন হঠাৎ বিদেশী সেনা কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে তিনি শহীদ হন। তাঁর ইন্তেকালে এলাকায় শোকের মাতম বয়ে যায়। তিনি সকলের কাছে স্মৃতি হয়ে যান। এমনকি এখনও গেলে আমাদের গ্রামে আমার দাদার নাম বললে মানুষ দ্রুত চিনতে পারে। তাই মাঝে মাঝে আফসোস হয়, এমন একজন দাদার সাক্ষাতও পেলাম না! আল্লাহ জান্নাতে আমাদের সাক্ষাত করিয়ে দিন। আর তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।
আমীন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.